কোটা সংস্কার আন্দোলন ২০২৪ - একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন
“কোটা
সংস্কার
আন্দোলন
২০২৪”
একটি স্বাধীন দেশের
স্বপ্ন
- নিয়ামুর রাক্বীব
২০২৪ এর জুলাই মাস আমার জীবনের আদল পরিবর্তন ঘটিয়েছে। আমি আমাকে নতুন করে চিনেছি। এই আত্মোপলব্ধির ভয়াল স্মৃতি আমি আমার ভাষায় লিপিবদ্ধ করছি।
২০১৮ সালে কোটা সংস্কারের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সরকারের গৃহিত কোটা নীতির বিরুদ্ধে হাইকোর্ট ৬ বছর পরে এসে হুট করেই রায় দেয়। তারই প্রেক্ষিতে ২০২৪ সনের জুলাই মাসের শুরু থেকেই কোটা সংস্কার আন্দোলন পুনরায় শুরু হয়। এই বিষয়ে শুরু থেকেই আমার নিজস্ব মতামত এই ছিল যে, সরকার প্রধান ভারতীয়দের যেই ট্রানজিত সুবিধা বাংলাদেশের মধ্যে দিচ্ছে তা থেকেই নজর সরাতে এই কোটা আন্দোলনের ইস্যু তৈরী করে, নতুবা কেন দীর্ঘ ৬ বছর ঝুলে থাকার পর হুট করেই আদালত অসাংবিধানিক “মুক্তিযোদ্ধা কোটা”র পক্ষে রায় দেয়? বলা বহুল্য বাংলাদেশের সকল বিবেকবান নাগরিকই জানেন বাংলাদেশের আইন-কানুন, আদালত এমন কি সুপ্রীম কোর্ট-কেও সরকার কতটা নিয়ন্ত্রন করতে পারে।
সরকার প্রধানের দফায় দফায় উষ্কানীমূলক বক্তব্য কোটা সংস্কার আন্দোলনের আগুনে ঘি ঢালার কাজ করে, যার ভিতর অন্যতম ছিলো “মুক্তিযোদ্ধার নাতিপুতিদের দিবো না তো কি রাজাকারদের নাতিপুতিদের দিবো”। ১৫ই জুলাই ২০২৪ইং তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে সরকারপন্থী ছাত্রলীগ আক্রমন চালায়, এমন কি নারীরাও সেই আক্রমনের হাত থেকে রেহাই পাননি। বলে রাখা ভালো, বার কাউন্সিলের পরীক্ষার প্রস্তুতির লক্ষ্যে আমি সারাদিন বই নিয়েই পড়ে ছিলাম, সুযোগ পেলেই নিউজ পোর্টাল, ফেইসবুক, ইউটিউব, এক্স (টুইটার)-এ খবরগুলো দেখছিলাম। তখন নজর কাড়লো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের রক্তাত্ত ছবিগুলো। নিজেকে খুবই কাপুরুষ মনে হলো। কিসের জন্য পড়ালেখা করছি, কেন করছি? অ্যাডভোকেট হয়েই বা কি করবো যদি না সরাসরি ছাত্র-ছাত্রীদের এই যৌক্তিক আন্দোলনে অংশ না নিতে পারি?
১৫ই জুলাই দিবাগত রাতে বাল্য বন্ধু রাফিউল ওসমান সাথে কথা হলো, বন্ধু একমত পোষণ করলো পর দিন ১৬ই জুলাই ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে অবস্থান গ্রহণ করবো রাজপথে। রাত ২টায় যখন ঘুমাতে যাই তখন বৌ বললো, ‘কাল যদি বের না হও তাহলে তুমি কাপুরুষ’। সারারাত আর ঘুম হলো না।
১৬ই জুলাই, ২০২৪ এর স্মৃতিঃ
১৬ জুলাই সারা সকাল খবর দেখলাম, উত্তরাতে দুপুর দেড়টার পর ছাত্র-ছাত্রীরা রাস্তায় অবস্থান নিবে। আমি জানিনা কোথায় কিভাবে অংশগ্রহন করবো। যোহরের নামাজ পড়ে আল্লাহ্র নামে বেরিয়ে পড়লাম, বৌ রান্নাঘর থেকে খেয়ে বের হতে বললো, পিছুডাক না শুনেই বের হলাম। দু’দফায় বাহন বদল করে উত্তরা আজমপুর গিয়ে পৌছলাম, এরই ভিতর বন্ধু রাফির সাথে যোগাযোগ করে তার অবস্থান জেনে নিলাম। দুপুর তখন দুইটা। রাস্তায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।রাফির সাথে তার স্কুলের বন্ধু ছিলো, ওদের দু’জনকে নিয়ে ঢাকা-ময়মনসিংহ হাইওয়ে (আজমপুর মেইন) রোডে গিয়ে চক্ষু চড়কগাছ। রাস্তায় হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রী, রাস্তা ব্যারিগেড দিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিচ্ছে। “তুমি কে? আমি কে? রাজাকার... রাজাকার... কে বলেছে? কে বলেছে? স্বৈরাচার... স্বৈরাচার...”
দুপুর ৩টার পর পর রাফি আর তার বন্ধু চলে গেলো, সকাল থেকে তারা না খাওয়া। আমিও ভাবছিলাম ফিরবো। ভাবলাম হাটতে হাটতে হাউজবিল্ডিং মোড় পর্যন্ত যাই, তার মধ্যেই আন্দোলনের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা যাবে। ছাত্র-ছাত্রীরা বিভিন্ন স্লোগান, আলপনা রাস্তায় আঁকছিলো। ২/৩ জনকে দেখলাম মনমুগ্ধকর একটা বাংলাদেশের মানচিত্র বাংলাদেশের পতাকা সমেত একেছে। এই প্রজন্মের দেশের প্রতি অগাথ ভালোবাসা দেখে গর্বে বুক ভরে উঠলো।
কিছুদূর এগুতেই বাবার ফোন, রিসিভ করতেই জানালো আমার ছোট ভাইও আন্দোলনের মাঠে, ওকে যেন খুঁজে বের করি। এত হাজার হাজার মানুষের ভিতর আমি একজন মানুষকে খুঁজে বের করবো কিভাবে?
ছাত্র-ছাত্রীরা পুলিশ-র্যাব দেখলেই দুয়োধ্বনী দিচ্ছিলো। অন্যদিকে একই ছাত্র-ছাত্রীরাই এ্যাম্বুলেন্স এবং বিদেশ গামী যাত্রীদের পথ করে দিচ্ছিলো যেন তারা সময় মত গন্তব্য পৌছতে পারে। আমি যতটুকু পারি ফোনে ছবি ও ভিডিও ধারণ করছিলাম। হাউজ বিল্ডিং ও আজমপুরের মাঝামাঝি, বিএনএস সেন্টারের সামনে এসে দেখলাম ভিতর থেকে কে যেন গ্লাস ভেঙ্গে নিচে ফেলছে, স্টুডেন্টদের জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম সকাল ১০টার পর পর ওই জায়গায় সরকারী পেটোয়া বাহিনী ছাত্রলীগের কর্মীরা ছাত্র-ছাত্রীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে স্টুডেন্টরা সমন্বিত ভাবে তাদের প্রতিহত করে এবং ছাত্রলীগ স্থান ত্যাগ করে পলায়ন করে। এরপর থেকেই প্রতিটি ছাত্র-ছাত্রী আত্মরক্ষার স্বার্থে হাতে লাঠি বা বাঁশের কঞ্চি তুলে নেয়। একমাত্র আমার হাতেই তখন পর্যন্ত কিছু ছিলো না। আরেকটু সামনে এগুতেই আমি আমার ছোট ভাইকে দেখতে পাই মানুষের ভীড়ের মধ্যে, সে আন্দোলন ছেড়ে বাসায় ফিরতে নারাজ। আমিও ভাবলাম ফিরবো না, একাএকাই আন্দোলনের পরিস্থিতি ঘুরে ঘুরে দেখবো। উত্তরা স্কয়ার (ওষুধ) কোম্পানীর বহুতল দালানের ছায়ায় ছাত্র-ছাত্রীরা দাঁড়িয়ে স্লোগান দিচ্ছে, সেখানে যেতেই অপরিচিত এক ছেলে এসে হাতে একটা গদা সদৃশ্য লাঠি ধরিয়ে দিয়ে বললো “ভাই, হাত ফাকা রেখেন না, মানাচ্ছেনা”, আমিও স্মিত হেসে উপহারটা সদরে গ্রহণ করলাম। আরেকটু হাটতেই আজমপুর মসজিদ গেটে দেখলাম জটলা, গিয়ে দেখি ছাত্রলীগের এক কর্মীকে ছাত্র জনতা বেদম গনধোলাই দিচ্ছে, জিজ্ঞেস করে জানতে পারি তার কাছে একটা পিস্তল পাওয়া গিয়েছে।
দুপুরের সূর্যের তিব্রতা বিকেল নাগাদ পশ্চিমে হেলে পড়তে ছাত্র-ছাত্রীরা কিছুটা স্বস্থি ফিরে পেলো, সবাই কমবেশি ঘামে ভেজা। আমারও গলা শুকিয়ে কাঠ, রোদের তিব্রতা সবাইকেই নাজেহাল করে ফেলেছে। আমার মাথা থেকেও কখন যে ঘরে ফেরার চিন্তা দূর হয়ে গেছে জানিনা। বিএনএস সেন্টারের সামনের ওভার ব্রিজে উঠে দেখলাম জনসমাগম রাজলক্ষ্মী অব্দি দেখা যায়, মরিচিয়ার মত শুধু মানুষের মাথা দেখা যায়, যারা প্রধান সড়কে অবস্থান নিচ্ছে।
এর ভিতর বেশ মজার মজার ব্যাপার ঘটলো। দু’একটার বর্ণনা দেই, এক পুলিশ সদস্য চালক সমেত বাইকে করে ছাত্র-ছাত্রীদের ভিড়ের মধ্য থেকে যাবার চেষ্টা করলে সকলে তাকে দূয়োধ্বনী দিতে আরম্ভ করলো, সে চাইলেই চলে যেতে পারতো কিন্তু তা না করে বাইক থামিয়ে সবাইকে বকাবকি করে বসলো, ফলে স্টুডেন্টরাও ক্ষেপে গিয়ে তাকে বাইক থেকে নামিয়ে হেটে যেতে বাধ্য করলো। ওদিকে দুই র্যাব সদস্য ছাত্র-ছাত্রীদের দূয়োধ্বনী ও তাড়া খেয়ে বাইক টেনে পালালো। বুঝলাম, এই প্রজন্ম যথেষ্ট সাহসী, আমরা কলেজ-ইউনিভার্সিটি জীবনে প্রশাসন-কে ভয় পেয়ে চলতাম।
ঠিক সন্ধ্যা নামার আগে আগে ছাত্র-ছাত্রীরা জটলা পাকিয়ে সমাবেশ করে। তাতে আন্দোলন চালিয়ে যাবার আহ্বান জানিয়ে সম্মিলিত মিছিল বের করে সেইদিনের মত কার্যক্রম শেষ করার সিদ্ধান্ত হয়। আমিও এক মিছিলের সাথে সাথে উত্তরার জমজম টাওয়ারের দিকে পা বাড়ালাম, মিছিলের আরেক অংশ চলে গেলো আশুলিয়ার দিকে। মিছিল শেষ করে আমি আমার ছোট ভাইকে সাথে নিয়ে বাসায় ফিরলাম সন্ধ্যার সময়।
সেদিন রাতে নিউজে দেখলাম কি নির্মম ভাবে রংপুরে আবু সাঈদ (২৩) কে পুলিশ ক্লোজ রেঞ্জে গুলি করে হত্যা করে। এই নির্মমতার জন্য ১৯৭১-এ আমাদের স্বাধীনতাকামী বীরেরা দেশ স্বাধীন করেননি, আজ সেই পাক-হানাদারেরা শাসক রুপে বাংলাদেশের ফিরে এসেছে।
কিন্তু আমি জানতাম না এর চাইতেও ভয়াবহ দৃশ্যের সাক্ষী হতে হবে আমাকে। পরদিন ১৭ই জুলাই, বুধবার, কাটিয়ে দিলাম সংবাদ দেখে-পড়ে। এতটুকু বুঝলাম সরকার যেই আন্দোলন ঘি ঢেলে ঢেলে সাজিয়েছে তার নিয়ন্ত্রন আর সরকারের হাতে নাই। পরদিন বৃহস্পতিবার “বাংলা ব্লকেড”-এর ডাক দেয়া হলো। সারারাত ঘুম হলো না।
ভয়াল বাংলা ব্লকেডের স্মৃতি (১৮ই জুলাই, ২০২৪ইং)
বেশ বেলা করে ঘুম ভাঙ্গলো, ভোর ৪টায় ঘুমিয়েছিলাম। উঠে দেখলাম বাসা ভর্তি মেহমান। কারো সাথে কথা বললাম না তেমন। ছোট ভাই বার বার এসে অভিযোগ করছিলো সে বের হতে পারছে না মেহমানদের জন্য, বাবাও নিষেধ করছে বের হতে, তাতে সায় দিয়ে বোদ্ধাদের মতন মেহমান বুদ্ধিজীবিদের বক্তব্য। মাথা না থাকলে মাথা ব্যাথাও থাকেনা। আমি ছোট ভাইকে আশ্বাস দিলাম মেহমান চলে গেলে বের হবো। নিউজ ঘাটাঘাটি করলাম কিছুক্ষণ, ইন্টারনেটের গতি বেশ কম ছিলো। কিছুক্ষণ পর খেয়াল করলাম ছোটভাই বাসায় নাই। কোন এক ফাকে সে বেরিয়ে গিয়েছে। অবাক হলাম, আমাদের সময় আমরা এত বেশি সাহসী ছিলাম না। দুপুরের আগে আগে ধীর গতির ইন্টারনেটে দেখলাম দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারী বাহিনী পুলিশ-র্যাব-বিজিবির সাথে ছাত্র-ছাত্রীদের সংঘর্ষ চলছে, আবু সাঈদের মৃত্যু ছাত্রসমাজ মেনে নিতে পারেনি। বিভিন্ন স্থানে দেখলাম স্কুল কলেজের মেয়েরাও নেমেছে আন্দোলনে। ছোট ভাইয়ের সাথে কথা হলো, সে পরামর্শ দিলো যেন না যাই আন্দোলনের মাঠে, পরিস্থিতি খুবই খারাপ।
নিজের কাছে নিজেকে খুবই ছোট মনে হলো। আমার মা পরামর্শ দিলো যেন পানি নিয়ে যাই আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের জন্য, বৌ-কে বললাম যতগুলো পানির বোতল পাও পানি ভরে রাখো। রুমে টানিয়ে রাখা পতাকাটা খুলে ব্যাগে নিলাম। কিছু মাস্ক ও পানির বোতলগুলো ব্যাগে ভরে রওনা দিলাম ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পশ্চিম পাশে উত্তরা ৭ নাম্বার সেক্টরের দিকে। বন্ধু রাফির সাথেও কথা হলো, সে জানালো সেও আসবে।
যখন পৌছলাম, উত্তরা আধুনিক হাসপাতাল (বাংলাদেশ মেডিকেল নামে পরিচিত)-এর সামনে দেখলাম কালো ধোয়া, সেক্টরের ভিতর দিয়ে ঢুকে দেখলাম রাস্তার মোড়ে মোড়ে আগুন জ্বালানো, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা টিয়ার শেলের জালাপোড়া থেকে বাঁচতে এই ব্যবস্থা করেছে। ছোটভাই জানালো ওরা কিছু বন্ধুরা কোন এক রোডে অবস্থান নিচ্ছে, টিয়ারশেলের ধোয়ায় সবার অবস্থা নাজেহাল। আমিও ওদের খুঁজতে লাগলাম। উত্তরা হাইস্কুল সংলঘ্ন পূর্ব পাশের রোডে দেখলাম আনুমানিক দেড়-দু’শ ছাত্র-ছাত্রীদের মিছিল, সবাই টিয়ার শেলের ধোয়ায় বিধ্বস্ত, অনেকে রাবার বুলেটে আহত, হাত পা পিঠ থেকে রক্ত ঝরছে, একজনের পিঠে দেখলাম ডজনখানেক রাবার বুলেটের আঘাত যার কিছু চামড়ার ভেতর পর্যন্ত বিধে রয়েছে, তবুও মিছিল চালিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে। আমি মিছিলের সাথে মিশে গিয়ে সবাইকে মাস্ক-গুলো বিলিয়ে দিলাম, শেষে মাস্কের অভাবে নিজেরটা খুলেও দিয়ে দিলাম আরেকজনকে। কয়েকজনকে ব্যাগ থেকে পানির বোতলগুলো বের করে বিলিয়ে দিলাম, তারা জানালো পানির সমস্যা নাই, ৭ নাম্বার সেক্টরের বেশির ভাগ বাসার সামনে বাসিন্দারা পানির ব্যবস্থা করে রেখেছেন, বাস্তবেও তাইই দেখলাম।
মিছিলের সাথে সাথে এগুলাম কিছুদূর, সেক্টরের ভিতরে গিয়ে ছোট ভাইকে খুঁজে বের করলাম, ওখানে ২০/২৫ জন শিক্ষার্থী অবস্থান নিয়েছে। ওরা জানালো প্রধান সড়কে তুমুল সংঘর্ষ চলছে এখনো, ওখানে সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর পুলিশ দফায় দফায় রাবার বুলেট নিক্ষেপ করছে, একই সাথে টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড। এরই মাঝে কোন এক সময় বন্ধু রাফিকে ফোনে জানালাম উত্তরার পশ্চিম পাশের অবস্থা, না আসতে অনুরোধ করলাম।
ওখানের ছেলেপেলেদের বললাম সেক্টরের ভিতরে বিভক্ত অবস্থান না নিয়ে সবাই যেন দলবদ্ধ হয়ে থাকে, সবাইকে নিয়ে উত্তরা হাই স্কুলের সামনের মিছিলে যোগ দিলাম। সবাই তখন বেশ বিদ্ধস্ত, সেক্টর মসজিদের সামনের ছায়ায় জিরিয়ে নিচ্ছে সবাই। এরই মাঝে এক রিক্সা চালক মামা এসে চিৎকার করে ঘোষনা দিলো “মামা, মেইন রোড স্বাধীন হইছে”, শিক্ষার্থীরা মনবল ফিরে পেলো। সবাই নতুন করে মিছিল আরম্ভ করলো, দ্রুতই সবাই ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের দিকে এগিয়ে যেতে থাকলো।
উত্তরা আজমপুরে লাগোয়া মহাসড়কের দিকে এগুতেই চোখ-নাক-মুখ জ্বলতে শুরু করলো, বুঝলাম ভুল করে ফেলেছি নিজের মাস্কটাও অন্যকে দিয়ে। ব্যাগ হাতরে পুরনো ব্যবহার করা একটা মাস্ক পেলাম। সেটা ভিজিয়ে নিয়ে মুখে দিলাম, কিন্তু তাতে তেমন কোন কাজ হলো না। আজমপুর পর্যন্ত আসতেই কানে গুলি ছোড়ার শব্দ আসতে থাকলো, প্রধান সড়ক পার হলেই পূর্ব পাশে উত্তরা পূর্ব থানা। পুলিশ থানার সামনে গোল করে ব্যারিকেড দিয়ে দলবদ্ধ অবস্থান নিয়েছে। প্রধান সড়কের উত্তর পাশ, বিএনএস সেন্টারের দিক থেকে হাজার খানেক ছাত্র-ছাত্রী দৌড়ে চলে আসলো আজমপুর, পুলিশও গুলি ছোড়া বন্ধ করলো, দূর থেকে দেখলাম পুলিশ হাত জোর করে শিক্ষার্থী ছাত্র-ছাত্রীদের কিছু একটা ইঙ্গিত দিলো। ছাত্র-ছাত্রীরা চিৎকার করে বলতে লাগলো ‘ওরা (পুলিশ) স্যারেন্ডার করেছে, কেউ আক্রমন করবেন না’, আমি এমন অদ্ভুত ঘটনার সাক্ষী এই প্রথম হলাম। সবাই থানার বিপরীত পাশে, পশ্চিমে, অবস্থান নিলো। ছাত্র-ছাত্রীরা পুলিশদের উদ্দেশ্য করে দূয়োধ্বনী দিতে শুরু করলো। আমার পতাকাটা ঘাড়ে বেধে রেখেছিলাম। আমি ধু ধু বালির মরুভূমিতে আশা দেখলাম, না! এ আশা মরিচিকা নয়। কয়েক হাজার তরুন তরুনী, যাদের বেশির ভাগই বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত নন-গ্রাজুয়েট, যৌক্তিক দাবিতে রাজপথে নেমে এসেছে, এই জাতির ভবিষ্যত কখনোই অন্ধকার হতে পারেনা।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পুলিশের কোন এক কর্মকর্তা ডেকে পুলিশ ব্যারিকেডের কাছে নিয়ে গেলো, কথা চলতে চলতেই শুনলাম মাথার ওপর সাউন্ড গ্রেনেড ফাটছে, সবাই শব্দ আর আলোর তিব্রতায় দিক ভ্রান্ত হয়ে ছোটাছোটি করতে আরম্ভ করলো। আমিও শিক্ষার্থীদের সাথে পিছু হটলাম, আজমপুর বাস স্ট্যান্ড সংলঘ্ন (পশ্চিম পাশের এভিনিউ রোড) রবীন্দ্র সরণী-তে অবস্থান করলাম। ছাত্ররা তখন ছত্রভঙ্গ, ডেকে নিয়ে আক্রমন করাটা অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিলো। দূর থেকে দেখলাম ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্দেশ্য করে থানার ছাদ হতে সাদা গেঞ্জি পরা কেউ একজন আক্রমন চালাচ্ছে। আমি ঘটনার ভিডিও ধারণ করছিলাম, খেয়াল করিনি আমার দু’হাত পিছেই একটা টিয়ার শেল বা কাঁদানী গ্যাস এসে পড়েছে। পিছন থেকে কেউ একজন আমাকে চিৎকার করে জানালো সেটা। পিছে তাকিয়ে দেখলাম টিয়ার শেল থেকে সাদা ধোয়া বের হচ্ছে, প্রথমেই যেটা মাথায় এসেছিলো তা হচ্ছে শেলটা তুলে ছুড়ে মারবো, কিন্তু পিছনে থাকা ছাত্রটা আমাকে নিষেধ করলো, বললো ‘ভাই দৌড় দেন, ধইরেন না, গরম’ ছেলেটা দৌড়ে চলে গেলো রাজউক কমপ্লেক্সের দিকে। আমিও দৌড়াতে শুরু করলাম তার পিছু পিছু, কিন্তু ততক্ষণে বড্ড বেশি দেরি হয়ে গেছে। কাঁদানী গ্যাসের বেশ খানিক অংশ আমার ফুস ফুস জালিয়ে দিলো, মাথা ভো ভো করে ঘুরতে শুরু করলো, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো। জানিয়ে রাখা ভালো, আমার চোখ খুবই সংবেদনশীল, মনে হলো চোখ দুটোতে মরিচ ডলে দেয়া হয়েছে। ক্ষনিকের জন্য মনে হলো আমি জ্ঞান হারাবো। মাথায় পানি ঢাললাম, চোখে পানি দিলাম, তাতে তেমন কোন কাজ হলো না। পতাকাটা খুলে ভিজিয়ে মাথায় বেধে নিলাম। রাজউক কমার্শিয়াল কমপ্লেক্সের সামনে কিছুক্ষণ বসে থাকলাম, ছাত্র-ছাত্রীরা আবারো ভিড় করলো রাস্তার মোড়ে। আমার মাথা ঘুরানো তখন কিছুটা কমেছে। ঘড়িতে তখন ৩টার কিছু বেশ-কম। তাকিয়ে দেখলাম স্কুল-কলেজের বহু ছাত্র-ছাত্রী আমাদের সাথে অবস্থান করছে, এমন কি আমার সামনেই স্কুলে পড়া বাচ্চা দু’টো মেয়ে বসে ছিলো, তাদের পরবর্তীতে কি হয়েছে তা জানিনা।
আবারো ছাত্র-ছাত্রীদের মাথার ওপর সাউন্ড গ্রেনেড বিষ্ফোরিত হলো বেশ কিছু, কাঁদানী গ্যাসের সাদা ধোয়ায় চারপাশ একাকার। আমরাও ছত্র ভঙ্গ ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে রবীন্দ্র স্বরণীর পশ্চিমে কিছুটা ভেতরে এসে অবস্থান নিলাম, অনুভব করলাম পিঠে কাধের কাছে জ্বলে উঠলো, কিন্তু তখন খেয়াল করার পরিস্থিতি নাই। আবারো চোখ-মুখ জ্বলতে শুরু করেছে। জায়গায় জায়গায় আগুন জালিয়ে সেই যন্ত্রনা কমাতে চেষ্টা করছে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা, আমিও তাতে যোগ দিলাম। কেউ একজন টুথ পেস্টের টিউব নিয়ে সবাইকে পেস্ট বিলিয়ে দিচ্ছিলো, বলে রাখা ভালো টুথ পেস্ট চোখের নিচে দিলে চোখের জ্বালা পোড়া বেশ কমে যায়। আমি সেখান থেকে কিছুটা নিয়ে নিজের চোখের নিচে মাখালাম, আরো কয়েকজনের মুখে পেস্টের আস্তরণ বিছিয়ে দিলাম, কাউকে দূরের মনে হলো না, মনে হলো সবাই আমার মায়ের পেটের ভাই।
এরই মাঝে দেখলাম ছাত্র-ছাত্রীরা আবারো এগিয়ে যাচ্ছে প্রধান সড়কের দিকে, আবারো আক্রমন চললো থানার ছাদ থেকে। বহু ছাত্র-ছাত্রীকে হতাহত হতে দেখলাম চোখের সামনে। এরই মাঝে আমার বন্ধু মাইল খানেক বেশি হেটে এসে যুক্ত হলো আমার সাথে। আমরা রাস্তার মোড়ে আগুন জালিয়ে একটা অস্থায়ী ক্যাম্পের মত করলাম, কয়েকজন দফায় দফায় আমাদের কেস ভর্তি পানি সরবারহ করে গেলো। আক্রমনের স্বীকার হয়ে ছাত্র-ছাত্রীরা আগুনের কাছে এসে দাঁড়িয়ে পানি খেয়ে আবারো ফিরে গেলো প্রধান সড়োকের দিকে। দফায় দফায় আহত ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে আসা হলো প্রধান সড়কের সামনে থেকে, রিক্সা চালকেরা বিনা মূল্যে তাদের হাসপাতালগুলোতে নিয়ে গেলো। আমি চোখের সামনে স্বাধীনতা যুদ্ধ দেখলাম, আমি ৭১ দেখলাম, আমি ২৫শে মার্চ দেখলাম।
সময় যতই চলতে লাগলো এ যুদ্ধের ভয়াবহতা ততই বাড়তে লাগলো। আমরা যেখানে অস্থায়ী ক্যাম্প করেছিলাম সেখান থেকে আমাদের পিছু হটতে হলো, আমার বন্ধু যেতে না চাইলেও তাকে জোর করে বিদায় দিলাম কারণ উত্তরার পূর্ব পাশে ওর বাসা, এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে সে ফিরতে পারতো না কখনোই।
বিকেলের দিকে ভয়াবহতা আরো বাড়লো, প্রধান সড়ক থেকে লাশ আসতে শুরু করলো। রাবার বুলেট ফুরিয়ে গেছে পুলিশের এমন খবর ছড়িয়ে পড়লো চারিদিকে, আমরা সাউন্ড গ্রেনেড বা ফ্ল্যাশ ব্যাং এবং টিয়ারশেল ছোড়ার শব্দ পাচ্ছিলাম ক্ষণেক্ষণে। একটা ছেলেকে দেখলাম তাকে লক্ষ্য করে লাইভ
রাউন্ড বা যুদ্ধে ব্যবহৃত গুলি ছোড়া হয়, সেটা তার গলার ভিতরে ঢুকে
এফোড়-ওফোড় বেরিয়ে গিয়েছে, তাতে তার গলার এক পাশ
বৃত্তাকারে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তাকে যখন রিক্সায় করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো হাসপাতালের দিকে তখন তার দেহে প্রাণ নেই। স্বাধারণ জ্ঞান যা বলে, হাই ক্যালিবার
রাউন্ড ব্যবহার করা হয়েছে তাকে হত্যা করতে। আমি হত্ববিহবল হয়ে তাকিয়ে থাকি, তখন আমার মাথায় কিছুই কাজ করছে না। পকেট থেকে ফোন বের করে এই ভয়াবহতা রেকর্ড করবো সেই মানসিক পরিস্থিতিও আমার তখন নেই। এমন ভয়াবহতা শুধুই সিনেমায় মানায়। পর পর ২ জনের লাশ নিয়ে যেতে দেখলাম আমি।
আমি টিভি সিনেমা ছাড়া এই জীবনে এমন কিছুর সাক্ষী হবো তা কল্পনাও করিনি কখনো।
আমরা আরো ক্ষানিকটা পিছিয়ে পশ্চিম পাশে উত্তরা হাই স্কুলের রাস্তা (২ নং সড়ক) মোড়ে অবস্থান নিলাম। কারো একজনের ফোনের ভিডিও-তে দেখলাম আজমপুরে র্যাবের গাড়িতে ক’জনকে পিশে দেয়া হয়েছে, একজন জায়গায় প্রাণ হারায়, তার মৃত দেহটা পুলিশ টেনে হিচড়ে থানার ভিতরে নিয়ে যায়। রাস্তার পাশে বসে থাকলাম কিছুক্ষণ,
অদ্ভুত এক ঘোরের ভেতর। কাপুরুষত্বের সত্বীত্ববোধ কেটে গেছে, আফসোস হলো খুব! কেন যে
আমার গায়েও একটা গুলি লাগলো না? ৭ নাম্বার সেক্টর মসজিদ থেকে তখন আসরের আজান ভেসে
আসছিলো, আর মহাসড়কে একেরপর এক গুলির আওয়াজ। একে একে আহতদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো
ক্রিসেন্ট হসপিটাল সহ অন্যান্য হাসপাতালগুলোতে।
মৃত্যু এতটাও সহজ তা আমি কখনো কল্পনাও করিনি, মানসিক ভাবে আমি বিদ্ধস্ত হয়ে পড়ি, ততক্ষণে বুঝে গেছি, নেত্রীত্বহীন এ আন্দোলন আজ একপাক্ষিক যুদ্ধ মাত্র। অস্ত্রের বিপরীতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ইট-পাটকেল কিছুই করার ক্ষমতা রাখেনা। যারা এই হত্যাকান্ড চালাচ্ছে, কিসের জন্য চালাচ্ছে? ২ পয়সা বেতন মানুষের বিবেক লুটে নিতে পারে কি?
সামনে হাটা পথের উপর লাল জার্সি পরা একটা ছেলে বসা, দশম শ্রেণীতে পড়ে।
হাতে তার হাতুড়ি। কি অদ্ভুত মানসিকতা, সে গুলির বিরুদ্ধে হাতুড়ি নিয়ে যুদ্ধ করবে।
ছেলেটাকে আর সামনে এগুতে দিলাম না, বললাম ‘এবার বাড়ি ফিরে যাও, দেশের জন্য যথেষ্ট
করেছো, পারলে দেশটা ছেড়ে চলে যেও কখনো সুযোগ হলে’। ছেলেটা হাসলো শুধুই, মনে হলো না
আমার কথা তেমন গুরুত্ব দিলো, অথচ আমার সাথে বসেই সে একের পর এক নিথর দেহের মিছিল
চেয়ে চেয়ে দেখেছে। যেখানে আমি মানসিক ভাবে বিকারগ্রস্থ হয়ে পড়ছি সেখানে তার সাহসের
রেখা কমেনি এক দাগও। এই জাতি বিজয়ী জাতি, এই জাতির ভবিষ্যৎ কখনোই অন্ধকার হতে
পারেনা।
সন্ধ্যার ঠিক আগে আগে ছোট ভাইকে নিয়ে বাসায় ফিরলাম, মানসিক-শারীরিক দুই ভাবেই আমি তখন বিদ্ধস্ত। এক অদ্ভুত উপলব্ধি হলো নিজের ব্যাপারে, আমি ভিরু-কাপুরুষ। তারাই বরং সাহসী যারা বারবার গিয়ে বুক পেতে গুলিবিদ্ধ হয়েছে, অকাতরে জীবন বিলিয়ে এসেছে। কাধে একটা রাবার বুলেট (যাতে কোন ক্ষত হয়নি) আর বুক ভর্তি টিয়ার শেলের ধোয়া ছাড়া আমার তেমন কোন ক্ষতি হয়নি।
১৮ই জুলাই ২০২৪ইং তারিখ রাত ৮টার কিছু পরে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেয়া হয় পুরোপুরি। সিম কিংবা ব্রডব্যান্ড, সকল নেটওয়ার্ক থেকে বাংলাদেশকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। ১৮ই জুলাই ২০২৪ইং তারিখ, শেষ খবর যখন পেয়েছিলাম তখন সারাদেশে নিশ্চিত শহীদের সংখ্যা ৫৩ জন। নিম্নে শহীদদের সংখ্যার, এলাকা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিতে, তালিকা দেয়া হলোঃ
·
AIUB এর ৩ জন;
·
IUB এর ৫ জন;
·
চট্টগ্রাম বাকলিয়া সরকারি কলেজ এর ২ জন
·
BUFT এর ১ জন;
·
শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটির ১ জন;
·
Imperial Collage এর ১ জন;
·
IUT এর ১ জন;
·
MIST এর ১ জন;
·
Northern
University এর ১ জন;
·
DRMC এর ১ জন;
·
East West এর ১ জন;
·
Uttara University এর ১ জন;
·
মাদারীপুর গভার্মেন্ট কলেজ এর ১ জন;
·
মাদারীপুর এরিয়াল স্কুল এর ৩ জন;
·
সরকারী দেবেন্দ্র কলেজ এর ১ জন;
·
সরকারী মহিলা কলেজ এর ১ জন;
·
টঙ্গী কলেজ এর ১ জন;
·
যাত্রাবাড়ি ২ জন;
·
নরসিংদী ৬ জন;
·
কুমিল্লা বিশ্বরোড ৭ জন;
·
টাঙ্গাইল ২ জন;
·
উত্তরা হাই স্কুল এ্যান্ড কলেজ এর ২ জন
·
নারায়ণগঞ্জ মহিলা কলেজের ১ জন;
·
বগুড়া আজিজুল হক কলেজের ২ জন।
আমার ব্যক্তিগত ধারণা ১৮ই জুলাই ২০২৪ইং তারিখ আরো অনেক বেশি ছাত্র-ছাত্রীর প্রাণহানী হয়, কারণ শুধু উত্তরাতেই এক স্থানে ৫ জন শহীদ হন, আর পাঁচশতাধিক আহত হন। এটা সুনিশ্চিত যে সরকার বরাবরের মতই দায় এড়াতে “সব দোষ বিএনপি-জামাতের” বলেই ক্ষ্যান্ত দিবে। ১৫ থেকে ২০ বছরের ছেলে মেয়েরা রাজনীতির কিই বা বুঝে? আমি যুদ্ধক্ষেত্রে কোন বিএনপি কিংবা জামাতের ‘দলীয় নেতাকর্মী’ দেখিনি সেদিন, আমি কোন দলের এজেন্ডা দেখিনি, বরং দেখেছি একদল আশাবাদী উদ্যমী তরুন-তরুনী যারা শুধুই একটা যৌক্তিক দাবিতে রাস্তায় নেমে এসেছিলো। যাদের বুক ভরা ছিলো অভিমান, আবু সাঈদকে হত্যার অভিমান।
কিন্তু প্রাকৃতিক ভাবেই ১৮ই জুলাই-এ সারাদেশে ঘটা হত্যাযজ্ঞের পর এই যুদ্ধ আর কোটা সংস্কার আন্দোলন নেই, এই যুদ্ধ স্বাধীনতার যুদ্ধ, দ্বিতীয় স্বাধীনতার যুদ্ধ। এই যুদ্ধ সরকার শুরু করেছে, নিরীহ ছাত্র সমাজ নয়। প্রাথমিক ভাবে সরকার এই আন্দোলনকে সাময়িক ভাবে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করলেও এখানেই এর শেষ হবেনা, ১৯৫২ সালের পর দীর্ঘ ১৯ বছর অতিবাহিত হবার পরেই মহান স্বাধীনতার যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়। আমরা অর্জন করি এক স্বাধীন বাংলাদেশ। এর শেষ এখনই হবেনা, ইতিহাস তার সাক্ষী।
পরবর্তী ঘটনা প্রবাহঃ
পরদিন ১৯শে জুলাই, ২০২৪ইং তারিখ ছিল শুক্রবার। আকাশে থোকায় থোকায় সাদা
শুভ্র মেঘ, যেন নীলের বুকে ভেসে চলেছে সাদা হাওয়াই মিঠাই। আমার সেদিকে মন নেই,
সারা রাত ঘুমাতে পারিনি, বারংবার রক্ত-নিথর দেহের মানুষ-ছাত্রদের লাশ আমায় তাড়া
করে ফিরেছে। গতদিন আমার কল্পনাতেও ছিলো না নিরস্ত্র ছাত্র-ছাত্রীদের লক্ষ্য করে
প্রাণঘাতী গুলি ছোড়া হবে।
টানা ৫ দিন ইন্টারনেট বন্ধ থাকলো, একই সাথে কার্ফিউ চালু থাকলো এবং
‘দেখা মাত্র গুলি’ করার আদেশ প্রদান করলো সরকার। সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বে এখান-সেখান থেকে
ঠিকিই আন্দোলনের খবর পাচ্ছিলাম। সারা দেশে সেই পাঁচদিনে অগনিত হতাহত হয়, সংখ্যাটা
নেহাত কম নয়। এর মাঝেই খবর পাই মিরপুরে ব্যাপক হতাহতের ঘটনার, র্যাবের হেলিকপ্টার
থেকে গুলি ছোড়ার খবরও গোপন থাকেনা। সত্যি বলতে তখন আমি এই খবরও অবিশ্বাস করতে
পারছিলাম না। ২০শে জুলাই, ২০২৪ইং তারিখের সন্ধ্যার পর আরেক বাল্যবন্ধু ইসমাইলের সাথে দেখা,
সে তার ফোন বের করে দেখালো হেলিকপ্টার থেকে গুলি হবার ভিডিও যা সে নিজে ধারণ
করেছে। মোহাম্মদপুরের জাপান গার্ডেনের আশে পাশের এলাকায় র্যাব মুহুর্মূহু গুলি
ছুড়েছে এলোপাতাড়ি।
ঠিক ৫ দিন পর যখন ইন্টারনেট সংযোগ ধীর গতিতে ছাড়া শুরু করলো সরকার, তখন
১৯শে জুলাই থেকে ২৪শে জুলাই এর মধ্যে দেশে ঘোটে যাওয়া ভয়াবহতা একে একে সামনে আসা
শুরু করলো। বলা বাহুল্য তখনও ফেইসবুক, ইউটিউব, এক্স (টুইটার) সহ অন্যান্য সামাজিক
যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ করে রেখেছিলো সরকার। কিন্তু স্মার্ট জেনারেশন তাতেও দমে যাবার
পাত্র নয়, ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্কের (ভিপিএন) ব্যবহার করে ঠিকিই টেলিগ্রাম
সহ অন্যান্য যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে হতাহতের চিত্র তুলে ধরছিলো। ঠিক একই সময় সরকারের
পক্ষ থেকে একের পর এক বিবৃতি প্রদান করে পুরো ঘটনাকে আরো ঘোলাটে করার ব্যর্থ
চেষ্টা চলতেই থাকলো, কিন্তু হলো হিতে বিপরীত।
যদিও সরকারী হিসাবে ১৫ জন শিশু সহ মোট ২৬৬ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত
করা হয়, কিন্তু একই সাথে গোয়েন্দাবাহিনীর লোকেরা হসপিটালগুলোর এন্ট্রিবুক জব্দ
করার খবরও আর চাপা পড়ে থাকেনা। এটা গ্রহনযোগ্য এবং বিশ্বাসযোগ্য যে নয়শতাধিক
(৯০০+) ছাত্র-জনতা এই কয়দিনে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি এবং সেনাবাহিনীর গুলিতে প্রাণ
হারান। আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় সেনাবাহিনীর সশস্ত্র ইউনিটকে নিরস্ত্র জনতাকে লক্ষ্য
করে লাইভ রাউন্ড ছুড়তে দেখা যায়, ফলে সেনাবাহিনীর প্রতিচ্ছবি জাতির নিকট কীট
পতঙ্গের ন্যায় নেমে যায়, এতটুকু বোঝাই যায় বাংলাদেশের মানুষ এই সেনাবাহিনীকে আর
কখনোই আগের মত সম্মানের দৃষ্টিতে দেখবেনা। এক রাতেই মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার কবরস্থানে কবর দেয়া হয় ৩৬ জনের অজ্ঞাত (শহীদের) লাশ।
জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে দেশের অদ্ভুত কিছু রদবদল ঘটতে শুরু করলো।
সরকার পূর্বের মত হত্যা চালিয়ে পার পেয়ে গেলো তা বলা যাবে না, বরং ‘বৈষম্যবিরোধী
ছাত্র আন্দোলন’ ৯ দফা দাবি উপস্থাপন করে বসলো। সরকারও ভুলের পর ভুল পদক্ষেপ গ্রহণ
করা শুরু করলো। এটি চাক্ষুস প্রমানিত যে শহীদ আবু সাঈদকে শর্ট রেঞ্জে ইয়াসিন আলী
নামক পুলিশ কর্মকর্তা গুলি করে হত্যা করে, তা সত্ত্বেও এজাহারে ১৬ বছরের আলফি শাহরিয়ারের নাম
আসামীর তালিকায় দিয়ে ঘটনাকে জাদুবিদ্যার বলে দিনের আলোতে পরিবর্তন করা হয়, কি
নির্মম এবং নিষ্ঠুর তা কল্পনাতীত। এক রাতে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’
এর ৬ সমন্বয়ককে ধরে ডিবি কার্যালয়ে বন্দি করা হলো এবং লিখিত বক্তব্য পাঠ করানো
হলো, তাতে তারা ঘোষনা দিলো আন্দোলন এখানেই ইস্তফা। ডিবি প্রধান হারুন একের পর এক
সরকারী সাফাই বাক্য পাঠ করতে থাকলো, সে দাবী করলো ডিবি তাদের এ্যারেস্ট করেনি বরং
নিরাপত্তা দিতেই তাদের কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয়েছে, তাতে পুরো ব্যাপারটা একটা
কমেডিতে রুপান্তরিত হলো। কিন্তু এই জেনারেশনকে যতটা আহম্মক ভাবে আওয়ামী সরকার, সরকারকেই ততটা আহম্মক প্রমান করে ছাত্র সমাজ পূণরায় আন্দোলন শুরু করলো। ইন্টার্নেটে ছড়িয়ে গেলো সমন্বয়কেরা মোর্স কোডের মাধ্যমে HTS (HELP THE STUDENT) বার্তা প্রেরণ করেছেন, তবে সত্যি বলতে উক্ত লিখিত বক্তব্য দেবার সময় তাদের অস্বস্থি লক্ষ্য করার মত ছিলো। ছাত্র আন্দোলন এরপর থেকে অদম্য হয়ে
উঠলো। এরই মাঝে সারা দেশে ৬০০০+ ছাত্র-জনতাকে প্রকাশ্যে রাতের অন্ধকারে ব্লক রেইড
দিয়ে হাস্যকর মিথ্যা মামলায় এ্যারেস্ট করা হয়, যাদের বেশির ভাগই শিক্ষার্থী।
হতভাগা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতগুলোকে অপ্রাপ্ত বয়স্ক কিশোরদের রিমান্ডে পাঠাতে দেখা
গেছে।
এখন সরকারের পদত্যাগই এই আন্দোলনের একমাত্র লক্ষ হয়ে উঠেছে, তাই
হওয়াটাই স্বাভাবিক নয় কি?
সরকার তথাকথিত শোক দিবসের ডাক দিলে ছাত্র জনতা তাদের অনলাইন প্রোফাইল শোকের কালোর পরিবর্তে ক্রোধের লালে রাঙিয়ে তোলে।
ছাত্র-ছাত্রীদের পাশে অন্যান্য পেশাজীবীরাও, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ, একাত্বতা প্রকাশ করে
আন্দোলনের মাঠে নেমে আসছেন। এই জাতি যে খুন, যে
রক্তের সাক্ষী হয়েছে তাতে তাদের সাহস কমেনি বরং বেড়েছে। ছাত্ররা হাসিমুখে
আত্মবিশ্বাসের সাথে প্রিজন ভ্যানে উঠে যায়, পিছন ফিরে বলে "ইনকিলাব জিন্দাবাদ"। এই তো সেই জাতি, এরা তো তারাই যারা
ইংরেজদের খেদিয়ে বিদায় করেছিল, যারা পাকিস্তানীদের খেদিয়ে বিদায় করেছিল, যারা
স্বৈরাচার এরশাদকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছিল। ৩১শে এপ্রিল, ২০২৪ইং তারিখ সুপ্রিম
কোর্টের শতাধিক আইনজীবী ছাত্র-ছাত্রীদের পাশে এসে দাড়ান। পুলিশের গাড়ি থেকে আটককৃত
একাধিক ছাত্রদের তারা ছিনিয়ে নিয়ে আসেন যা জাতির কাছে প্রশংসনীয় হয়েছে।
এরই মাঝে আসলো “রেমিটেন্স শাট ডাউন” কর্মসূচির ডাক, তাতে যতদূর বুঝছি প্রবাসী
ভাই-বোনেরা বেশ সাড়া দিচ্ছেন। সরকার অর্থনৈতিক চাপে পড়ছে। প্রবাসীদের হৃদয়ে যেই
রক্তক্ষরণ তাতে এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। আপনি কি পারতেন আপনার সন্তানকে গুলি করে
হত্যা করার জন্য তার হত্যাকারীকে গুলি কিনে দিতে?
সর্বপরি, আমি-আমরা ভবিষ্যৎ জানিনা। জানিনা আমাদের সাথে কি হতে যাচ্ছে। কিন্তু এতটুকু হলফ করে বলতে পারি, এই জাতির ভবিষ্যৎ মোটেই অন্ধকার নয়। যেই জেনারেশন ভবিষ্যতের হাল ধরতে তৈরী সেই জেনারেশন বুলেট ভয় পায় না। রক্ত ভয় পায় না। লাঠির বাড়ি ভয় পায় না। ভয় পায় না সত্য বলতে। এই জেনারেশন রুখে দাড়াতে জানে, জানে বুক পেতে শহীদ হতে।
মুক্তির মন্দির সোপানতলে
কত প্রাণ হলো বলিদান
লেখা আছে অশ্রুজলে
কত বিপ্লবী বন্ধুর রক্তে রাঙা
বন্দীশালায় ঐ শিকল ভাঙা
তারা কি ফিরিবে আর
যত তরুণ অরুণ গেছে অস্তাচলে
(এর চাইতেও ভয়াবহতার সাক্ষী হয়েছি, সংগত কারণে প্রকাশ থেকে বিরত থাকছি।)
ব্যক্তিগত পর্যালোচনাঃ
আমি সামান্য লেখক, ভিরু গোত্রের। বর্তমানে আমি মানসিক ভাবে খুবই বিপর্যস্ত, রাতে ঘুম হচ্ছেনা। আমার বৌ জানালো ঘুমের ভেতর আমি ছটফট করতে থাকি। চোখ বুজলেই আমি দেখতে পাই সেই নিথর দেহগুলো। সামান্য দু'কলম লেখার বাইরে আমার কিছু করার মত সাহস নাই। আমি জানিনা আমার সারাজীবনে এই ভয়াবহ স্মৃতি কাটিয়ে ওঠা আদৌ সম্ভব কিনা। কিন্তু জানি,
আমি সাক্ষী ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়ের, আমি সাক্ষী এক নয়া মুক্তিযুদ্ধের। বিজয় আসবেই। ইনকিলাব জিন্দাবাদ।
-সমাপ্ত-
কিন্তু সমাপ্ত নয়






মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন